img

গাইবান্ধায় তিনব্যাপী ইজতেমা : হাজার হাজার মানুষের ঢল

2016-11-02 14:56:55
2016110218565542834.jpg

গাইবান্ধা জেলার সাত উপজেলাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আজ শুক্রবার (২৮ অক্টোবর) ভোর থেকেই ধর্মপ্রাণ মানুষ আল্লাহ তালার নৈকত্য হাসিলের উদ্দেশ্যে ইজতেমায় একত্রিত হতে থাকে হাজার হাজার মানুষ।

জুম্মার নামাজের ১ ঘন্টা আগ থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত গাইবান্ধা-পলাশবাড়ি সড়কের দু’পাশে প্রায় ৩ কি.মি. এলাকা জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। জুম্মার নামাজের সময় সড়কটি একেবারেই লোক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে আসতে আসতে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয় ওই রাস্তায়। নামাজের সময় ধর্মপ্রাণ মানুষরা যে যেখানে অবস্থান করছেন সেখান থেকেই নামাজে শরিক হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে যান।

এমনকি বাসের ও বাড়ির ছাদে, মাঠ-ঘাটের সকল স্থানেই এবং সড়কের দু’পাশে মানুষ নামাজে অংশ নেয়। সকালে আম বয়ান করেন মাওলানা হোসাইন, মাওলানা জাকির হোসেন, মাওলানা এনামুল হক। পরে জুম্মার নামাজের ইমামতি করেন তাবলিগ জামাতের মুরব্বী মাওলানা আশরাফ আলী। নামাজ শেষে মোনাজাতের সময় হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে আমিন আমিন শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরা এলাকা জুড়ে। দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি কামনায় অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

বৃহস্পতিবার জেলা তাবলিগ জামাতের আয়োজনে গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী সড়কের তুলসীঘাট কাশিনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বাদ ফজর থেকে বয়ানের মধ্য দিয়ে ইজতেমার কার্যক্রম শুরু হয়। শনিবার সকাল ৯টায় আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে ইজতেমার কার্যক্রম শেষ হবে। ইজতেমায় গাইবান্ধা জেলা ছাড়াও বিভিন্ন জেলা থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও তাবলিগ জামাতের সঙ্গীরা অংশ নেয়। ইজতেমা মাঠে তাবলিগ জামাতের প্রায় ৩শ’ স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছে।

গাইবান্ধা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ একেএম মেহেদী হাসান জানান, ইজতেমায় মুসল্লিদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য পুলিশের একাধিক টিম, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ও গ্রাম পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ইজতেমা মাঠে অতিরিক্ত পুলিশ কাজ করছে। এছাড়া বিশেষ নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে ইজতেমা এলাকা। এদিকে গাইবান্ধা পৌরসভার মেয়র মেয়র অ্যাডভোকেট শাহ মাসুদ জাহাঙ্গীর কবির মিলন ইজতেমা মাঠ পরিদর্শন ও ময়দানের খোঁজ খবর নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ইজতেমাটি পৌর এলাকার বাইরে অনুষ্ঠিত হলেও ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের যাতে কোন সমস্যা না হয় সেজন্য পৌরসভার পক্ষ থেকে সহায়তা করা হচ্ছে।

দ্বিতীয়বারের মতো তিন দিনব্যাপী ইজতেমায় প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সমাগম হবে বলে আশা করছে জেলা ইজতেমা আয়োজক কমিটি। তবে আয়োজক কমিটি জানায়, তাদের ধারণার বাহিরে ইজতেমায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মুসল্লি অংশ নেয়। এছাড়া জেলার তাবলিগ জামাতের ৯০টি দাওয়াতি জামাত ও একটি বিদেশি জামাত উপস্থিত রয়েছে। ইজতেমার ময়দানে তাঁদের নিরাপত্তা, থাকা ও খাওয়াসহ সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় জায়গা সংকুলান না হওয়ায় গাইবান্ধাসহ দেশের ৩২টি জেলায় পর্যায়ক্রমে এ রকম মিনি ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ইজতেমা মাঠে সার্বক্ষণিক ইবাদত-বন্দেগিতে নিয়োজিত রয়েছেন মুসল্লিরা। প্রতিদিন ফজর থেকে এশা পর্যন্ত ইজতেমা মাঠে ইমান, আমল, আখলাক ও দ্বীনের পথে মেহনতের ওপর বয়ান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বয়ানে বলা হয়, দুনিয়ার জিন্দেগি ক্ষণস্থায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের দিল থেকে আসবাবের (সম্পদের) এক্বিন বের না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর দিলে কুদরতি এক্বিন পয়দা হবে না। সবাইকে দ্বীনের জন্য মেহনত করতে হবে। আল্লাহর কাছে আমল ছাড়া এ দুনিয়ার জিন্দেগির কোনো মূল্য নেই।

বয়ানে আরো বলা হয়, দ্বীনের দাওয়াতের মাধ্যমে ইমান মজবুত হয়। ইমান মজবুত হলে আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর এ সম্পর্ক গড়ে উঠলে দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াবি হওয়া যায়।

বাংলাদেশে তাবলীগ আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৪ সালে। সে হিসেবে সুদীর্ঘ সাড়ে তিন যুগ ধরে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বিশ্ব ইজতেমা। ২০১১ সাল থেকে এক সাথে এতো ধর্মপ্রাণ মানুষের সংকুলান না হওয়ায় দু’পর্বে ইজতেমা চলার সিদ্ধান্ত হয়। সেই ধারাবাহিকতায়ই ‘তাবলীগ’ অনুসারীদের একটি বৃহত্তম সমাবেশ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা। তাবলীগ আরবি শব্দ, বালাগ শব্দ থেকে আগত। যার শাব্দিক অর্থ পৌঁছানো, প্রচার করা, প্রসার করা, বয়ান করা, চেষ্টা করা, দান করা ইত্যাদি। পরিভাষায় একজনের অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা নিজ ইচ্ছা ও চেষ্টার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানোকে তাবলীগ বলে। তাবলীগ আদর্শ যিনি পৌঁছেন, তাকে মুবাল্লিগ বলে। বিশ্বনবী (স) এ প্রেক্ষিতে বলেছেন, ‘আমার পক্ষ হতে একটিমাত্র বাণী হলেও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’

প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবত্ টঙ্গিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা। ইতোপূর্বে ঢাকার কাকরাইল মসজিদ ও সংলগ্ন রমনা উদ্যানের একাংশে অনুষ্ঠিত হতো এ সমাবেশ। ইজতেমার ইতিহাস তালাশ করলে জানা যায়, বাংলাদেশে ইজতেমা অনুষ্ঠানের প্রায় ৩/৪ যুগ পূর্বে ভারতের সাহরানপুর এলাকায় এ মহতী কাজের গোড়াপত্তন ঘটে। বর্তমান ধারায় এ তাবলীগী কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা ইলয়াস (রহ)। ১৯২০ সালে তিনি প্রচলিত তাবলীগ শুরু করেন।

তিনি এ কর্মপ্রয়াসকে তখন বলতেন ‘ইসালে নফস’ বা আত্মশুদ্ধির প্রাথমিক পাঠ। প্রথমত তিনি টেস্ট কেস হিসেবে ভারতের সাহারানপুর ও মেওয়াত এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। তিনি ৬টি বিশেষ গুণ অর্জনের মেহনত করেন জনসাধারণ্যে। সেই ছয়টি বিশেষগুণ হলো- কালেমা, নামাজ, এলেম ও জিকির, ইকরামুল মুসলিমিন (মুসলমানদের সেবা) সহীহ্ নিয়ত ও তাবলীগ। অন্য একটি গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, ইলয়াস (রহ) প্রথম বর্তমান ধারার এ তাবলীগকে নাম দেন ‘তাহরীকুস সালাত’ বা নামাজের আন্দোলন বলে।

কথিত আছে, ইলয়াস (রহ) প্রথম যখন মানুষের কাছে ধর্মীয় প্রচার শুরু করেন, তখন তেমন কোনো সাড়া মিলেনি। তাই তিনি অভিনব এক কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি আশপাশের দিনমজুর, শ্রমিক-কৃষকদের ডেকে এনে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রেখে দু’ বেলা খাবার দিতেন এবং তাদেরকে নামাজ শিক্ষা দিতেন, নামাজের সুরা শিখাতেন, ধর্মীয় বিধি-নিষেধ বর্ণনা করতেন। অবশেষে বিদায় বেলা তাদের প্রত্যেককে মজুরি তথা পারিশ্রমিক দিয়ে দিতেন। এ পদ্ধতি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হলো। অল্প সময়ের ব্যবধানেই তার নামাজের আন্দোলনের সদস্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হয়ে পড়লো। জনগণ নিজেরাই নিজ অর্থ ব্যয় করে ইলয়াস (রহ)-এর পদাঙ্ক অনুকরণ করে দাওয়াতী কার্যক্রম চালাতে থাকেন।

যখন বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের প্রচেষ্টা শুরু হয়, তখন এর নাম ছিলো শুধুই ইজতেমা। যা অনুষ্ঠিত হতো ঢাকার কাকরাইল মসজিদে। ১৯৬৪ সালে কাকরাইলে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের ইজতেমা শুরু হয়। ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, তারপর ১৯৬৫ সালে টঙ্গীর পাগারে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন থেকে ধীরে ধীরে এগুতে এগুতেই আজকের টঙ্গীতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা। যে ইজতেমায় অংশগ্রহণ করে বিশ্বের প্রায় একশটি রাষ্ট্রের তাবলীগ প্রতিনিধিরা। শিল্পনগরী টঙ্গীতে ইজতেমাকে স্থানান্তরিত করা হয় ১৯৬৬ সালে।

আর সে বছর থেকেই তাবলীগ জামাতের এই মহাসম্মেলন ‘বিশ্ব ইজতেমা’ নামে খ্যাতি অর্জন করে। মুসলিম উম্মাহর সর্ববৃহৎ সম্মেলন হজে যেমন বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের মুসলমানদের সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য আর ঐক্যেও প্রেরণার অভাবনীয় নজির দেখা যায়, বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতেমায়ও দেখা যায় মুসলিম ঐক্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা। এর ফলে পুণ্যভূমি মক্কা-মদিনার পর তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা পরিচিতি লাভ করে বিশ্ব মুসলিমের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিলনকেন্দ্র হিসেবে। এর ধারাবাহিকতায় আজ দেশের ৩২টি জেলায় মিনি ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

যতটুকু জানা যায়, ইজতেমা নিয়ন্ত্রণকারী তাবলীগ জামাতের কোনো সংবিধান নেই। অলিখিত সংবিধানও নেই। লিখিত আইন, বিধিবিধান ও উপবিধি কিছুই নেই। তারপরও এ আন্দোলন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং সুশৃঙ্খল আন্দোলন। তাবলীগ জামাতের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি আছে। এটিকে বলা হয় মজলিসে শুরা। এ কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। ২১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও বহু ব্যক্তি এ কমিটির মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তাবলীগে যারা অপেক্ষাকৃত বেশি অবদান রেখেছেন, তারাই এ কমিটির আলোচনায় কথাবার্তা বলেন। তবে কে কতো বেশি অবদান রেখেছেন, তা’ নির্ধারণেরও মাপকাঠি নেই।

তাবলীগ আন্দোলনে ক্ষমতা বা পদমর্যাদার কোনো প্রতিযোগিতা নেই, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। নেতৃত্বের কোন্দল নেই। যিনি একবার কেন্দ্রীয় শুরায় আমির নির্বাচিত হন, তিনি আমৃত্যু সে পদ অলঙ্কৃত করেন। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য কোনো আন্দোলন নেই, ষড়যন্ত্র নেই। তাবলীগ অনুসারীরা তাদের আমিরকে সম্বোধন করেন ‘হজরতজী’ বলে। ঢাকা মহানগরীতে অবস্থিত কাকরাইল মসজিদ বাংলাদেশ তাবলীগ জমাতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বা হেড কোয়ার্টার।

img

সম্পর্কিত পোস্ট